Thu. Oct 29th, 2020

রাজনীতির অম্লান নক্ষত্র আব্দুস সামাদ আজাদ

শান্ত কুমার তালুকদার-

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আব্দুস সামাদ আজাদ একটি আলোকিত নাম। একটি অম্লান নক্ষত্র। মাটি থেকে মহিরুহ সামাদ আজাদ একজন ত্রিকালদর্শী রাজনীতিবিদ। ব্রিটিশ আমলে তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি। পাকিস্তান শাসনামলেই একজন সংগ্রামী ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে এর অভূদ্যয় ও রূপান্তরের এক অন্যতম কান্ডারি। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি।
বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনে অসামান্য অবদান রাখেন এই ক্ষণজন্মা পুরুষ। মেধা ও বিচক্ষণতা দিয়ে নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার এক সফল দৃষ্টান্ত আব্দুস সামাদ আজাদ। ১৯২২ সালের ১৫ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ভোরাখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ৭১’র মুক্তিযুদ্ধের আগে তিনি আব্দুস সামাদ নামেই পরিচিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি নামের সঙ্গে আজাদ সংযুক্ত করেন।
ছাত্র অবস্থাতেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪০ সালে সুনামগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি হন। পরবর্তীতে আসাম মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি পদও অলংকৃত করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি সিলেট এমসি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু সরকারবিরোধী রাজনীতির কারণে এমএ শেষপর্বের পরীক্ষা দেয়া হয়নি তাঁর।
মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন বিলুপ্ত হলে আব্দুস সামাদ আজাদ নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯৪৯-৫০ সালে এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। আব্দুস সামাদ আজাদ একজন ভাষা সংগ্রামী। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের যোগাযোগ মন্ত্রী আব্দুর রব নিশতার সিলেট সফরে আসলে তিনি একটি ছাত্র প্রতিনিধিদল নিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। তখন ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়। পরে তিনি ভাষা আন্দোলনের কে›ন্দ্রীয় নেতৃত্বে সম্পৃক্ত হন। প্রথমে সিলেট পরে ঢাকায় এই আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে দশজনি মিছিল করার প্রস্তাবকও তিনি। ওইদিনই তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন।
ভাষা আন্দোলনের পর নতুন রাজনৈতিক দল পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) গঠিত হলে তিনি পিডিপিতে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে পিডিপির প্রার্থী হিসেবে যুক্তফ্রন্ট থেকে নির্বাচন করে পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এর পর আওয়ামীলীগে যোগ দিয়ে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের পর মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি ন্যাপে যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে ন্যাপের সহ-সম্পাদক ও দলের পার্লামেন্টারি বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। আইয়ূব খান ক্ষমতা দখলের পর আব্দুস সামাদ আজাদের সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু এক সময়ে গ্রেপ্তার হন। প্রায় চার বছর জেলে থাকার পর ১৯৬২ সালে মুক্তি পান। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে তিনি আবার আওয়ামীলীগে ফিরে আসেন এবং বৃহত্তর সিলেট আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া এই জননেতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রী পরিষদের উপদেষ্টা এবং ভ্রাম্যমাণ রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব¡ পালন করেন। ১৯৭১ সালের ১৩-১৬ মে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জোড়ালো ভূমিকা পালন করেন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর আবদুস সামাদ আজাদ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি গঠিত মন্ত্রিসভায় তাঁকে পুনরায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশের স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির যাত্রা শুরু হয়। পরে তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের কৃষি, সমবায় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীরও দায়িত্ব¡ পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তাঁকে এক সপ্তাহ গৃহবন্দি করে রাখা হয়। পরে ২২ আগস্ট তাঁকে গ্রেপ্তার করে জাতীয় চার নেতার সঙ্গে কারাগারে রাখা হয়। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতা হত্যাকান্ডের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত একই সেলে তিনি তাঁদের সঙ্গে বন্দি ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় সামরিক আদালতে আব্দুস সামাদ আজাদকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দণ্ডিত করা হয়। চার বছর কারাভোগের পর ১৯৭৯ সালে তিনি মুক্তিলাভ করেন। মুক্তিলাভের পর সেই সংকটময় সময়ে আওয়ামীলীগকে সংগঠিত করতে আত্মনিয়োগ করেন। দলে আত্মকলহ, চরম দ্বন্ধ ও ভাঙন দেখা দিলে তিনি দূরদর্শী ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতে নেতৃত্ব তুলে দিতেও তাঁর রয়েছে ঐতিহাসিক ভূমিকা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলকে সংগঠিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। দলের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে আন্দোলন, সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বৈরাচার এরশাদের সময় ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করে তিনি পরাজিত হন। স্বৈরাচার পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনে তিনি সুনামগঞ্জ-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। এসময় সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনে তিনি জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তিনি আবারো একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামীলীগ একুশ বছর পর সরকার গঠন করলে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিরোধী দলের সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি পরলোক গমণ করেন।
আব্দুস সামাদ আজাদের তিরোধান বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর শূন্যতার সৃষ্ট করে। দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর হৃদতা। একজন সদালাপী, কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে দলের প্রান্ত থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সকল পর্যায়ে তাঁর ছিল ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা। রাজনীতির ধ্যান জ্ঞানে এই জননেতা গভীর রাত পর্যন্ত কর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। বৃদ্ধ বয়সেও তিনি অসুস্থ শরীরে সাংগঠনিক প্রয়োজন আর সামাজিক অনুষ্ঠানে ছুটে বেড়াতেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল। শুধু নিজ দলের কর্মী নয়; বরং ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গেও সদ্ভাব রাখতেন। প্রয়োজনে বাড়িয়ে দিতেন সাহায্যের হাত। অত্যন্ত পরহেজগার এই বর্ষিয়ান নেতা ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মানুষ। সংগঠন অন্তপ্রাণ বিরামহীন এই জননেতা প্রকৃত অর্থে ছিলেন রাজনীতির একজন সাধক পুরুষ। প্রয়াত জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদের ৯৮তম জন্ম বার্ষিকিতে বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *