Mon. Oct 26th, 2020

বুকের পাঁজরে ঢাকা দীর্ঘশ্বাস

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু : শুধুই কি মূল্যবোধের অবক্ষয়? আমরা জানি, প্রাণ আছে যার সে-ই প্রাণী। কিন্তু মানুষ? মানুষ কি শুধুই প্রাণীমাত্র? যুগে যুগে মানুষ নামধারী কোনো কোনো দৈত্য-দানবের হিংস্রতায় সমাজের মর্মমূল কেঁপে উঠেছে, এখনও উঠছে এবং এমন নজিরের অভাব নেই। কিন্তু সাম্প্রতিককালে যেসব লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে, এর প্রেক্ষাপট আমলে নিয়ে বাস্তবতা বর্ণনা-বিশ্নেষণ-ব্যাখ্যা সাধ্যাতীত। মানুষ যেমন শুধু প্রাণীমাত্র নয়, তেমনি মানুষ যদি না হয় মানুষ, তবে এর ভয়ঙ্করতা-বীভৎসতা-দানবীয়তা দুর্ভাবনার কোন দিগন্তে শুভবোধসম্পন্নদের ঠেলে দিতে পারে- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেও হয়রান হওয়ার দরকার পড়ে না। এমনিতেই মনোজগতে প্রশ্নের পাহাড় জমে ওঠে। এই গৌরচন্দ্রিকা ৩১ জুলাই সমকালের প্রথম পাতায় ‘হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে শিশু হত্যা’ শিরোনামযুক্ত সংবাদটি নিয়ে। শিরোনামের ওপরে সিঙ্গেল কলামে স্থান পেয়েছে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রাণপ্রদীপ নিভে যাওয়া ছয় বছরের নিলয়ের ছবি।

মনোবেদনায় দৃষ্টিগ্রাহ্য, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানো, ফুটফুটে শিশু নিলয়ের দিগন্তে দৃষ্টি মেলে অপলক চেয়ে থাকা ছবি যেন পটে আঁকা। এই ছবি একটি প্রশ্নই ছুড়ে দিয়েছে- এ কোন কৃষ্ণকাল সমাজদেহে বর্বরতার দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে? এ প্রশ্নের উত্তরও অনুত্তরিত মৌনতায়ই মেলে। ঘটনাস্থল কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর। ভাটিবাংলার এক জনপদের অবুঝ বালক নিলয়, যে কি-না জীবনের কোনো কিছু বুঝেই উঠতে পারল না, তার ওপর এমন নিষ্ঠুর কশাঘাত! আহারে, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকও যদি এই প্রাণপ্রদীপ নিভিয়ে দিত, তবুও সান্ত্বনার পথ খোঁজা যেত। কিন্তু না, এ তো মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ, বিকারগ্রস্ততার দাবানলের মর্মন্তুদ পরিণতি। যে বাঙালি সমাজে মনুষ্যত্ব ছিল অনুকরণীয়, তা আজ কোন গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে? কলম চলছে না, কম্পিউটারের কি বোর্ডেও আঙুল যায় না; শরীর-মন স্থবির হয়ে পড়ে। নৃশংসতার প্রচলিত সংজ্ঞাসূত্রেও নির্ণয় করা যায় না- মানুষ যদি না হয় মানুষ তবে সমাজদেহে দুরারোগ্য ব্যাধি কীভাবে জীবন বিপন্ন করে তুলতে পারে! শুধু প্রশ্নের পর প্রশ্ন; তবুও বেদনার ক্ষোভ, জিজ্ঞাসার ক্ষুব্ধতা কিছুতেই যেন ফুরায় না।

২৯ জুলাই কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের মাসকান্দি গ্রামে দুপুরেই নেমে আসে অমাবস্যা রাতের গাঢ় অন্ধকার। প্রতিবেশী ঘাতক হবি মিয়ার ক্রমাগত হাতুড়ির আঘাতে কৃষক আনোয়ারুল ইসলামের ছয় বছরের অবুঝ ছেলে নিলয়ের মাথা ও মেরুদণ্ড থেঁতলে যায়। তখনই নিলয়ের জীবনশঙ্কা প্রকট হয়ে ওঠে। প্রথমে কিশোরগঞ্জের ভাগলপুরে, পরে ঢাকা; কিন্তু এই বিপন্ন জীবনকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রায় সব সূত্র প্রয়োগ করেও আর প্রাণ রক্ষা করা গেল না। প্রায় ২৮ ঘণ্টা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে যন্ত্রণাকাতর নিলয়ের আর্তনাদ চারপাশ ভারি করে তোলে। ঘাতক হবি মিয়া প্রায় সময়ই নাকি বলত- একটা খুন করেই জেলে যাবে, তারপর থাকবে নিরাপদে। এই সমাজে এমন হবি মিয়ার সংখ্যা কত? ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া, বেড়ে ওঠা, কোনো কোনো বলবানের পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত-পালিত এমন হবি মিয়ারা সমাজে বোধহয় এখন অগণ্যই। যদি তাই না হতো তাহলে ধর্ষণ, ধর্ষণোত্তর খুন কিংবা আরও কত নৃশংসভাবেই না এমন শিশুদের নাম এভাবে কি মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হতো?

ভাবতে বিস্ময় লাগে, যুগপৎ প্রশ্ন জাগে- একজন বিকারগ্রস্ত হবি মিয়া প্রকাশ্য দিবালোকে একটি শিশুকে বর্বরতা-পৈশাচিকতার উন্মত্ততায় থেঁতলে দিল অথচ চারপাশের লোকজন নির্বাক হয়ে দেখল! কেউ প্রতিবাদ করল না! কেউ নিলয়কে রক্ষা করল না! যে সমাজে এমন নির্মমতা-নিষ্ঠুরতার মৌন প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা ক্রমেই স্ম্ফীত, সেই সমাজের নির্বাক প্রত্যক্ষদর্শীরাও তো অন্যরকমভাবে বিকারাক্রান্ত। তারা মিন্নির রিফাতকে বাঁচানোর আকুলতা দেখে ঠায় দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তারা রাজনের আর্তনাদ শুনে তাকিয়ে থাকে পাষণ্ডের দিকে! তালিকা আরও দীর্ঘ করা যাবে। অনেক নামই পুনঃস্মরণে চোখ ভিজে যাবে। এই পরিস্থিতিকে কী বলা যেতে পারে? একজন হবি মিয়া বিকারাক্রান্ত হয়ে নিলয়কে থেঁতলে দিল; কিন্তু এমন কত হবি মিয়া ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে জীবন ধসিয়ে দিচ্ছে- এর হিসাব আমরা ক’জন রাখি? নয়ন বন্ড হয়ে কেউ জন্মায় না। সমাজের স্বেচ্ছাচারী বলবানরা, অপরাজনীতির ধারক-বাহকরা নয়ন বন্ডদের নিজেদের লাভালাভের অঙ্ক কষে যুগে যুগে তৈরি করে চলেছেন, লালন-পালন করেছেন, করছেন। এই সমাজ যেন এদেরই অভয়ারণ্য; এরা দাপিয়ে বেড়ায় সর্বত্র। এদেরকে থানা-পুলিশ চেনে, প্রশাসন এদের সম্পর্কে জানে, হীনস্বার্থবাদী বলবানরা এদের ‘বিগ ব্রাদার’, ‘গডফাদার’। সমাজের অসুখ বাড়ছে, আলাপে-বিলাপে মানুষের অসহায়ত্ব প্রকাশ পাচ্ছে আর কিংকর্তব্যবিমূঢ়তাই যেন মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে! এমনটিই কি মেনে নিতে হবে? না, মানুষ যেহেতু শুধুই প্রাণীমাত্র না, সেহেতু এভাবে চলতে পারে না, চলতে দেওয়া যায় না। যারা রাজনীতির বায়ু বিষিয়েছেন, সমাজের শ্রীহানি ঘটিয়েছেন এবং জাতীয় জীবনের অনেক অর্জনের বিসর্জন ঘটিয়ে ভবিষ্যৎ অধিকতর কণ্টকাকীর্ণ করে তুলেছেন, তারা কীভাবে এত কদর্যতার দায় এড়াবেন?

নিলয়রা আমাদের সামনে দুঃসহতার স্মারক। আহারে! বুকটা কেঁপে ওঠে ধকধক করে এই সমাজের বহুবিধ নেতিবাচক ঘটনায়, বিপদসংকুলতায়। ৬ বছরের আত্মজ সহিষুষ্ণর নিষ্পাপ মুখটা ভেসে ওঠে মানসপটে। ভেসে ওঠে জন্মমাটির প্রতিবেশী সহিষুষ্ণর প্রাণাধিক বন্ধু নিলয় করের মুখাবয়বও। এমন আরও কত কত মুখ! দুই বছরের সাহস, তিন বছরের স্বীকৃতির কথাও ভাবি। ভাবি অর্ঘ্য, পিয়াস, জুবেল, মাহরুফ, শান্তা, আবিদা, রুবেলদের কথাও। কোন বৈরিতার অপচ্ছায়ায় এই দেশ-সমাজে লাখ লাখ নিলয়ের জীবন অনিশ্চয়তায় বেড়ে উঠছে! বিদ্যমান বাস্তবতার নির্মম কশাঘাতে সেই কবেকার লেখা কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের কাব্য পঙ্‌ক্তি আউড়িয়ে আমরা যেন এখন আর বলতে পারি না- ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’। কবির এই চিরন্তন আকুলতা চাপা পড়ে গেছে একের পর এক সংঘটিত মর্মান্তিকতার মর্মস্পর্শিতায়। এখন শুধু আতঙ্ক আর দুঃসময়ের প্রলম্বিত ছায়ায় দুরুদুরু বক্ষে হূৎপিণ্ড থেকে কম্পিত অনুচ্চারিত প্রার্থনা- আমাদের সন্তান যেন থাকে নিরাপদে। শিশু রাজনের পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যাচিত্র যে ঘাতক কিংবা তার সহযোগীরা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়; সায়মার মতো যে শিশু পাশবিক লালসার শিকার হয়ে প্রস্ম্ফুটিত হওয়ার আগেই চিরতরে হারিয়ে যায়; সেই সমাজ কতটা মনুষ্য বসবাসের উপযোগী?

আমরা কি শুধু দানবদের দানবীয়তায়ই এমন বিপদসংকুলতায় আছি? না, শুধু তা তো নয়। আমাদের জীবন, আমাদের সন্তানদের কল্যাণচিন্তা বারবার হোঁচট খায়। এমনকি রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিতকরণে, সাংবিধানিক শর্ত পূরণে এখনও আমরা অক্ষম। এ জন্যই কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের অপব্যবহার করে অগ্রাধিকার নেওয়ার নামে সাধারণের অধিকার হরণ করে চলেছেন। এই অগ্রাধিকার চর্চায়, অগ্রাধিকারের অপব্যবহারে নড়াইলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী গুরুতর অসুস্থ তিতাস ঘোষের প্রাণপ্রদীপ নিভে যায় আইসিইউ সুবিধা সংবলিত অ্যাম্বুলেন্সে ‘ভিআইপি’র জন্য ফেরিঘাটে আটকে থাকায়। শত অনুনয়-বিনয় সত্ত্বেও মুমূর্ষু তিতাসকে নিয়ে ফেরি কর্তৃপক্ষ ফেরি ছাড়তে রাজি হয়নি! ভিআইপির কাছে সাধারণের জীবন কি এতই তুচ্ছতুল্য! অসহায়ের মতো আমরা এসব মেনে নিচ্ছি। প্রশ্ন হচ্ছে- মেনে নিতেই কি থাকব?

আমরা সভ্যতা-মানবতা-উৎকর্ষের বুলি কপচাই। সভা-সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে নিলয়দের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কিংবা নিরাপদে বেড়ে ওঠার পথনকশা আঁকি। কিন্তু এর বিপরীতে এই যে ঘটে চলা ঘটনাবলি, সেসব কোন নিরিখে পর্যালোচিত হতে পারে? আমরা বীভৎসতার পরিসংখ্যান ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ করি। কিন্তু যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ চললেই কি অন্ধকার দূর হবে? পরিসংখ্যানের কচকচানিই কি সংকট নিরসন করবে? অনেকেই বিষাদগ্রস্ত হয়ে এ প্রশ্নও রাখতে পারেন- কত প্রসঙ্গে আর কতবার পথে নামতে হবে? সোজাসাপটা জবাব- যতবার মানুষের নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে, ততবার। যে বা যাদের কারণে নিলয়, তিতাসদের প্রাণপ্রদীপ নিভে যায় নিষ্ঠুরতার কশাঘাতে, ততবারই আমরা দাঁড়াব দৃঢ় প্রত্যয়ে। একই সঙ্গে এও মনে রাখা দরকার, আমাদের এ অঙ্গরাগ যেন মিছিলের পায়ে ওড়া ধূলি না হয়। নগর পুড়বার আগুন যেমন দেবালয়কেও কবলিত করে, তেমনি করেই ধর্মশিক্ষার আলয়গুলোও শেষ পর্যন্ত সর্বব্যাপী সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে।

নিলয়, তুমি নিষ্ঠুরতার বলি। তিতাস, তুমি ভিআইপির বিশেষ সুবিধার বলি। আমাদের পুত্রদ্বয়, বুকের পাঁজরে তোমাদের ঢেকে রাখি। এই বিপুলা দেশ তোমাদের-আমাদের কবে বাসযোগ্য হবে- এ প্রশ্ন অন্তহীন জিজ্ঞাসা হয়ে থাকতে পারে না।

সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *