Mon. Oct 26th, 2020

বরগুনায় শুটকি উৎপাদন করে কয়েক হাজার মানুষ জীবিকানির্বাহ করছে

সাগর উপকূলীয় বরগুনা জেলার পাথরঘাটা ও তালতলী উপজেলার চরাঞ্চলে প্রতি বছরের মতো এবারও বিভিন্ন চরে শুটকি তৈরীর কাজ শুরু হয়েছে। শুঁটকি তৈরীর এ কর্মকান্ডকে ঘিরে কর্মসংস্থান হয় উপকূলীয় এ এলাকার প্রায় দশ হাজার নারী পুরুষের। এখানকার শ্রমিকরা শুঁটকি তৈরিতে রাত-দিন ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বরগুনার লালদিয়া, আশারচর, সোনাকাটা, জয়ালভাঙ্গা চরের শুঁটকি পল্লীতে অক্টোবর থেকে মার্চ এ ৬ মাস ধরে চলে শুঁটকি পক্রিয়াজাতকরনের কাজ। শুঁটকিকে কেন্দ্র করে উপকূলীয় হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবীদের আনাগোনায় মূখরিত থাকে এসব চর।
সরেজমিনে দেখা যায়, গভীর সমুদ্র থেকে জেলেরা মাছ নিয়ে দেশের বৃহত্তম মৎস অবতরণ কেন্দ্র পাথরঘাটা (বিএফডিসি) ঘাটে ভিড়ছেন। ব্যবসায়ীরা সেই মাছ কিনে শুটকি পল্লীতে নিয়ে যাচ্ছেন। এরপর ধুয়ে-মুছে কাটা-বাছার পর শুটকির জন্য বাঁশের তৈরি মাচায় রোদে শুকাতে দিচ্ছেন। কেউ বাছাই করছেন আবার কেউ শুকনো শুঁটকি মাছ বস্তায় ভরছেন।
প্রচলিত পদ্ধতিতে শুকানো এই শুঁটকি নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। এখানের উৎপাদিত শুঁটকি দেশের বিভিন্ন স্থানে রফতানি হচ্ছে। এখানে প্রায় ২১ প্রজাতির মাছের শুঁটকি দেখা যায়। আহরিত মাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লইট্যা, বৈরাগী, ছুরি, ফাইস্যা, রইস্যা, পোয়া, কোরাল, মাইট্যা, রূপচাঁদা, ইলিশ, লাক্ষা, চিংড়ি, রাঙ্গাচকি, হাঙ্গর, রিটা, ফুটকা, কাঁকড়া, লবষ্টার, সামুদ্রিক শসা, হাঙ্গরের বাচ্চাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ।
বর্তমানে প্রতি কেজি ছুরি মাছের শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ৭শ’ থেকে ৯শ’ টাকা, রূপচান্দা ৮শ’ থেকে ১ হাজার, মাইট্যা ৫শ’ থেকে এক হাজার, লইট্যা ৪শ’ থেকে ৮শ’, কোড়াল ৮শ’ থেকে ১ হাজার ২শ’, পোয়া ৪শ’ থেকে ৮শ’, চিংড়ি ৮শ’ থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা এবং অন্যান্য ছোট মাছ ২শ’ থেকে ৪শ’ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও এখানকার শুঁটকি পল্লীর মাছের গুড়া সারাদেশে পোল্ট্রি ফার্ম ও ফিস ফিডের জন্য সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
শুটকি শিল্পের মাধ্যমে অনেকের কর্মস্থান হলেও রয়েছে নানা সমস্যা। খোলা মাঠে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ধূলা-বালিতে শুঁটকি উৎপাদন, শুঁটকি সংরক্ষণে মাছের সাথে বিভিন্ন ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ মিশ্রন, এমনকি বিষ মিশ্রিত করে শুঁটকি সংরক্ষণ করা, খাবার অনুপযোগী পঁচা মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকিতে রুপান্তিত করা, পুরো এলাকা জুড়ে মশা মাছির উৎপাতও বৃদ্ধি ইত্যাদি।
অন্যদিকে শুঁটকি উৎপাদনকারীরাও নানা সমস্যায় জর্জরিত। পুজির অভাব, মহাজনদের শোষণ, সরকারি সুযোগ সুবিধার অভাব, মাছের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া। বর্ষার কয়েকমাস ছাড়া বছরের বাকি সময়ে এখানে শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি শুঁটকি তৈরি হয় শীত মৌসুমে। আর এসময় শুঁটকি মহালে কাজ করে জীবীকা নির্বাহ করেন এখানকার শ্রমিকরা। যদিও শ্রম ও বেতন নিয়ে রয়েছে তাদের নানা অভিযোগ।
এছাড়া কিটনাশক ঔষধ ব্যবহার বন্ধ, স্বাস্থ্য সম্মত শুটকি তৈরি, বর্ষা মৌসুমে শুঁটকি তৈরির প্রযুক্তি সরবরাহ এবং এখাতে ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেলে শুঁটকি রপ্তানিতে অনায়াসে শত কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে।
উপকূলজুড়ে শুঁটকি উৎপাদনের বিরাট সম্ভাবনা থাকলেও পদে পদে রয়েছে বাধা। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব আর বাজারজাতকরণে বহুমূখী সমস্যার কথা জানালেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই শিল্পে আরও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এ শিল্পে জীবিকানির্বাহ হতে পারে বহু মানুষের। সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকা পাথরঘাটা ও তালতলীতে রয়েছে শুঁটকি উৎপাদনে অফুরন্ত সম্ভাবনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *